প্রথমে চক্রটি ভিকটিমদের নাচ শেখানোর নামে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সুন্দরী মেয়েদের ঢাকায় নিয়ে আসতো। তাদেরকে বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে ফেলা হত। পরবর্তীতে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশে বিভিন্ন চাকরির কথা বলে প্রলুব্ধ করে পাচার করতো।
শুক্রবার (২৯ অক্টোবর) র্যাবের অভিযানে রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, তেজগাঁও এবং চুয়াডাঙ্গা থেকে বিদেশে পাচার হতে যাওয়া ২৩ জন নারী ভিকটিম উদ্ধার এবং দুটি পাচার সিন্ডিকেটের মূলহোতাসহ ১১ জন গ্রেফতারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় র্যাব।
শনিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ঢাকার মোহাম্মদপুর, খিলক্ষেত ও চুয়াডাঙ্গা হতে পাচার চক্রের মূলহোতা- মো. কামরুল ইসলাম জলিল ওরফে ডিজে কামরুল, মো. রিপন মোল্লা (২২), মো. আসাদুজ্জামান সেলিম (৪০), মো. নাইমুর রহমান ওরফে শামীম (২৫), মো. নুর-নবী ভুইয়া রানা (৪৪), মো. আবুল বাশার (৫২), মো. আল ইমরান (৪১), মনিরুজ্জামান (৩৫), মো. শহিদ সিকদার (৫৪), প্রমোদ চন্দ্র দাস (৬২), টোকনকে (৪৫) গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় ৫৩টি পাসপোর্ট, ২০টি মোবাইল, ৮ বোতল বিদেশি মদ, ২৩ ক্যান বিয়ার, ২টি মোটরসাইকেল, ১টি ল্যাপটপ, ১ সেট কম্পিউটার, ৯১ হাজার ৪০ টাকাসহ মানবপাচার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি।
তিনি বলেন, তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশে মানবপাচারকারী চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত মো. কামরুল ইসলাম জলিল। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫-২০ জন। ২০১৯ সাল হতে এই চক্রটি সক্রিয়ভাবে মানবপাচার মত অপরাধ করে আসছে। চক্রটি দেশের বিভিন্ন জেলা হতে কমবয়সী মেয়েদের প্রতারণামূলক ফাঁদে ফেলে এবং প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে চক্রটি ভিকটিমদের নাচ শেখানোর নামে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সুন্দরী মেয়েদের ঢাকায় নিয়ে আসতো। তাদেরকে বেপয়ারা জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে ফেলা হত। পরবর্তীতে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশে বিভিন্ন চাকরির কথা বলে প্রলুব্ধ করে পাচার করতো।
এই ভাবে এই চক্রটি গত ২/৩ বছরে প্রায় শতাধিক মেয়েকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে। ভিকটিমদের পার্শ্ববর্তী দেশে মার্কেট, সুপারশপ, বিউটি পার্লারসহ লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করত। মূলতঃ পার্শ্ববর্তী দেশে অমানবিক এবং অনৈতিক কাজ করানোর উদ্দেশ্যে তাদের পাচার করা হতো। এই চক্রটি রাজাধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।
খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতারকৃতরা আরও জানায়, ভিকটিমদেরকে সীমান্তের অরক্ষিত এলাকা দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে। এই চক্রের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশের সিন্ডিকেটের যোগসাজশ রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশের চক্রের সদস্যরা ভিকটিমদের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে। অতঃপর বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন শহরে/প্রদেশে অনৈতিক কাজ করানোর উদ্দেশ্যে বিক্রয় করে দিত। এরপর থেকে ভিকটিমদের আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। এই চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত ডিজে কামরুল।
খন্দকার আল মঈন আরও বলেন, গ্রেফতারকৃত কামরুল ইসলাম ওরফে ডিজে কামরুল ২০০১ সালে কুমিল্লা হতে ঢাকায় আসে। প্রাথমিক পর্যায়ে সে বাড্ডা এলাকায় রিকশা চালক হিসেবে জীবিকা শুরু করে। কিছুদিন পর সে একটি কোম্পানির ডেলিভারি ভ্যানচালক হিসেবে কাজ নেয়। অতঃপর সে ড্যান্স গ্রুপের সাথে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সে হাতিরঝিল এলাকায় ‘ডিজে কামরুল ড্যান্স কিংডম’ নামে একটি ড্যান্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে। উক্ত ড্যান্স ক্লাবের মাধ্যমে সে বিভিন্ন উঠতি বয়সী মেয়েদের বিনোদন জগতে প্রবেশের নামে প্রলুব্ধ করত। একপর্যায়ে তাদের উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করে পার্শবর্তী দেশে পাচার করত।
গ্রেফতারকৃত মো. রিপন মোল্লা ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করে। সে মূলহোতার পক্ষে মানবপাচারে পার্শবর্তী দেশের দালালের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। সে পাচার যোগ্য নারীদের ছবি দালালের কাছে প্রেরণ করে। পার্শবর্তী দেশের দালালদের ওকে রিপোর্ট অনুযায়ী পার্শবর্তী দেশে পাচার করা হত।
গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন র্যাবের এই কর্মকর্তা।