শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন

মায়ের দোয়ায় ইমাম বুখারির চোখ ফিরে পাবার ঘটনা

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৩ মে, ২০২৪

হাদিস জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারি (রহ)। তাঁকে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরিফের রচয়িতা তিনিই। এই ইমাম শৈশবে একবার কঠিন অসুখে (বসন্ত) পড়ে গিয়েছিলেন। অসুখ ভালো হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু চোখ আর ভালো হয়নি। একেবারে অন্ধ হয়ে পড়েন।

ছেলে চোখে দেখতে পায় না এই দুঃখে অস্থির হয়ে পড়েন বুখারির মা। অনেক চিকিৎসা করান, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মা দুর্ভাবনায় ছটফট করেন। সারাজীবন কি ছেলে দৃষ্টিহীন থাকবে? ছেলের চিন্তায় রাতে তাঁর ঘুম হয় না।

একদিন গভীর রাতে মা সেজদায় পড়ে যান। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে কাতরভাবে মুনাজাত শুরু করলেন। বললেন, ‘হে পরোয়ারদিগার, তুমি আমাকে একটি সুন্দর ছেলে দিয়েছ। সোনার টুকরো ছেলের মুখ দেখে কত যে খুশি হয়েছি আমি! আজ সেই ছেলে অন্ধ। ছেলের
মুখের দিকে তাকালে কলিজা ফেটে যায়। হে আল্লাহ, তুমি আমার ছেলেকে সুস্থ করে দাও। তার চোখে আলাে দাও। তার অন্ধত্ব দূর করে দাও।’ কাঁদতে কাঁদতে রাত প্রায় শেষ। একসময় জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়লেন মা।

ঘুমের ঘােরে স্বপ্ন দেখেন হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর সামনে। বলছেন, “হে পূণ্যময়ী মা, আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনার ছেলে ভালাে হয়ে গেছে।’ জেগে উঠলেন তিনি। দেখলেন ফজরের সময় হয়ে এসেছে। অজু করে নামাজে দাঁড়াবার আগে তিনি ছেলেকে ডাকলেন। বললেন, “এসো বাবা, অজু করবে, নামাজ পড়বে।

মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল শিশু বুখারির। চোখ মেলে তাকিয়েই সে চিৎকার করে উঠল, “মা, আমি দেখতে পাচ্ছি! সব দেখতে পাচ্ছি। আমি ভালো হয়ে গেছি মা!’ আনন্দে, খুশিতে, আবেগে মা আবার সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। চোখের পানিতে শোকর আদায় করলেন আল্লাহর।

কী অমোঘ শক্তি মায়ের দোয়ার। এক রাতের প্রার্থনায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে তার আদরের দুলাল। যে মায়ের দোয়ার এত মূল্য আল্লাহর দরবারে, আমাদের উচিত সেই মায়ের সেবা করা। মায়ের মনে কষ্ট না দেওয়া। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

ইমাম বুখারি ১৯৪ হিজরি সালের ১৩ শাওয়াল রোজ শুক্রবার (৮১০ খ্রিস্টাব্দ) খোরাসানের বুখারা নামক (বর্তমানে উজবেকিস্তানের অংশ) স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ইসমাইল। তিনিও একজন হাদিসবিদ ছিলেন। বাল্যকাল থেকেই বুখারি প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। মাত্র ৬
বছর বয়সে তিনি পবিত্র কোরআন হিফজ করেন। ১০ বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে হাদিস শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হন। ইমাম বুখারি বলেন, ‘মক্তবে প্রাথমিক লেখাপড়ার সময়ই হাদিস মুখস্থ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমার মনে ইলহাম হয়।’ এ সময় তাঁর বয়স কত ছিল জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘১০ কিংবা তারও কম।’ (আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি, ফায়জুল বারি, মুকাদ্দামা, পৃষ্ঠা ৩৩)

১৮ বছর বয়স থেকেই তিনি হাদিসের পাঠ দেওয়া শুরু করেন। তিনি এতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যে তিনি যেখানেই যেতেন ইলমে হাদিস অন্বেষণে ছাত্ররা তাঁর পেছনে পেছনে ছুটত। নিশাপুরের ছাত্ররা তাঁর জ্ঞানের গভীরতার খবর শুনে অন্যান্য শিক্ষকের শিক্ষায়তন ছেড়ে তাঁর কাছে চলে
আসে। ফলে অনেক শিক্ষকের মজলিস ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ে। তাঁর মজলিসে ২০ হাজারেরও বেশি জ্ঞানান্বেষী সমবেত হতেন।’ ইসহাক ইবনে রাহবিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘হে জ্ঞানান্বেষী হাদিসবিশারদরা! এই যুবকের দিকে দৃষ্টিপাত করো এবং তার কাছ থেকে যা পারো হাদিস লিপিবদ্ধ করো। কারণ সে যদি হাসান ইবনে আবুল হাসান বা হাসান বসরি (রহ.)-এর যুগেও এই পৃথিবীতে আগমন করত, তবু তার হাদিসের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রতি মানুষ মুখাপেক্ষী থাকত।’ (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা-২৮)

হাদিসজগতের উজ্জ্বল এই নক্ষত্র ১ শাওয়াল ২৫৬ হিজরিতে ঈদুল ফিতরের রাতে এশার নামাজের পর সমরকন্দে ইন্তেকাল করেন। দাফনের পর তাঁর কবর থেকে মিশক আম্বরের মতো সুগন্ধি বের হতে থাকে এবং কবর বরাবর আকাশে লম্বাকৃতি একটি সাদা রেখা দেখা দিলে মানুষ তা বিস্ময়করভাবে প্রত্যক্ষ করে। পরে আল্লাহর একজন নেককার বান্দা আল্লাহর দরবারে এই সুগন্ধি বন্ধ করার জন্য দোয়া করলে তা বন্ধ হয়ে যায়। ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা-২৩)

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD