পারস্য উপসাগরের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার এক চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, বৃহস্পতিবার রাতেই ইরানের ওপর খুব ভয়াবহ হামলা চালাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
একই সাথে তিনি জানান, আমেরিকার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খার্গ দ্বীপ’ দখল করা এবং দেশটির সমগ্র তেল ও গ্যাস বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া। ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সর্বাত্মক যুদ্ধ অবসানের সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে বৃহস্পতিবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তীব্র পাল্টাপাল্টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলার পর ট্রাম্প এই নতুন হুমকি দিলেন।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় লেখেন, আজ রাতেই আমেরিকার সশস্ত্র বাহিনী ইরানের ওপর খুব বড় আঘাত হানতে যাচ্ছে। ইরানের নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, রাডার, বিমান বিধ্বংসী ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের আক্রমণাত্মক ক্ষমতার সিংহভাগ ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে!
তিনি আরও যোগ করেন, খুব নিকট ভবিষ্যতে আমরা ইরানের প্রধান জ্বালানি হাব খার্গ দ্বীপসহ অন্যান্য তেল অবকাঠামোগুলো নিজেদের দখলে নেব এবং তাদের তেল ও গ্যাস বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেব। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃহস্পতিবার আরও এক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের এই বার্তার জবাব না দিলেও, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, আমেরিকার সাম্প্রতিক একের পর এক হামলার কারণে গত এপ্রিলের শুরুতে সম্মত হওয়া যুদ্ধবিরতিটি এখন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই তীব্র উত্তেজনার মাঝেই তিনটি ইরানি সূত্র এবং পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা বা ব্যাক-চ্যানেল ডিপ্লোম্যাসি আরও জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড বা জব্দকৃত তহবিল অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধ এখন একটি কানাগলিতে রূপ নিয়েছে। আমেরিকা ইরান আক্রমণ করে তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, যার ফলে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ট্রাম্প বারবার চুক্তি খুব কাছাকাছি বলে দাবি করলেও মার্কিন কর্মকর্তারা এই আলোচনার বর্তমান স্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সামরিক পদক্ষেপ যে এই আলোচনারই একটি অংশ, তা স্পষ্ট করে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বুধবার বলেছেন, “আমাদের যদি বোমা দিয়ে দরকষাকষি করতে হয়, তবে আমরা বোমা দিয়েই আলোচনা করব; এবং আমরা এই কাজে খুবই পারদর্শী।”
খার্গ দ্বীপের গুরুত্ব ও পাল্টাপাল্টি হামলা: ইরান তাদের উৎপাদিত তেলের সিংহভাগ, দৈনিক প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২ শতাংশ, এই খার্গ দ্বীপের মাধ্যমেই মূলত চীনে রপ্তানি করে থাকে। তবে মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধের কারণে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি এমনিতেই বন্ধ রয়েছে। ফলে আমেরিকার এই দ্বীপ দখলের হুমকিতে তাৎক্ষণিকভাবে তেল সরবরাহে বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রভাব হবে মারাত্মক।
গত সোমবার হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার জের ধরে বৃহস্পতিবার চার ঘণ্টা ধরে ইরানের সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিমান প্রতিরক্ষা সাইটগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির বেশ কয়েকটি শহরে বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এর জবাবে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বৃহস্পতিবার তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটির ১৮টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর ‘পঞ্চম নৌবহর’ লক্ষ্য করে একযোগে কাউন্টার-অ্যাটাক চালিয়েছে।
পাশাপাশি জর্ডানের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশেই ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার পর তার ধ্বংসাবশেষ রাজধানী মানামা ও হামাদ শহরের আবাসিক এলাকায় ভেঙে পড়ায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু সামান্য আহত হয়েছে এবং বেশ কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলার আশঙ্কায় কুয়েত সরকার বৃহস্পতিবার সাময়িকভাবে তাদের দেশের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন যেকোনো মুহূর্তে এক রক্তক্ষয়ী মহাবিস্ফোরণের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স