শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

লাগামহীন সাইবার বুলিং

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন সোমা আক্তার (ছদ্মনাম)। হুট করেই দেখেন তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে আইডি খোলা হয়েছে। যেখানে এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন অশ্লীল ছবি পোস্ট করে খারাপ ক্যাপশন দেওয়া হচ্ছে। মুহূর্তেই বাড়তে থাকে সেসব ছবির লাইক-কমেন্ট। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে সোমার চিন্তা। কোনো উপায় না পেয়ে ছুটে যান সাইবার পুলিশের কাছে। তদন্তে উঠে আসে আর কেউ নন-তার আপন খালাতো ভাই তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করতে বুলিংয়ের পথ বেছে নিয়েছেন।

রাজধানীর শনিরআখড়া এলাকার বাসিন্দা বৃষ্টি খানম (ছদ্মনাম)। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে আরিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কিছুদিন পর দেখা করতে গেলে আরিফ কৌশলে তার আইডি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এরপর এআই দিয়ে বানানো বৃষ্টির অশ্লীল ছবি আপলোড করতে থাকেন আরিফ। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কাছ থেকে ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন।

শুধু সোমা ও বৃষ্টি নন-সারা দেশে এ রকম সাইবার বুলিংয়ের অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। সমাজমাধ্যমগুলো খুললেই চোখে পড়ে বিভিন্ন মানুষের নুড ছবি ও ভিডিও। বিশেষ করে নারীরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন বেশি। এ ক্ষেত্রে এআই জেনারেটেড পিক হয়ে উঠছে প্রধান হাতিয়ার। নারীরা কখনো স্বজনদের মাধ্যমে, কখনো প্রেমের ফাঁদে পড়ে, আবার কখনো সহপাঠীদের মাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

এদিকে পুলিশের সাইবার ইউনিটগুলোতেও সাইবার অপরাধের অভিযোগের পাহাড় জমা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জনবল সংকটে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। শুধু সাইবার বুলিংই নয়-ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে আইডি হ্যাক, ওটিপির ফাঁদে পড়ে অ্যাকাউন্টের সব টাকা খোয়ানো, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেল, জিমেইল হ্যাক, বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা, পণ্য বিক্রির ফাঁদে অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে সাইবার মাধ্যমে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রযুক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার সাপোর্ট সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, সেন্টারটি চালু হওয়ার দিন গত ২০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে ৯০৫টি সাইবারসংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) জমা পড়েছে। এর মধ্যে সাইবার বুলিংসংক্রান্ত ১৩০টি, টেলিগ্রামে আর্থিক প্রতারণা ২৩৭টি, ফেসবুকের বিভিন্ন প্রতারণা ১৫০টি, হারানো মোবাইলে লগইন করা আইডি ফিরে পাওয়াসংক্রান্ত ৭০টি, বিকাশ প্রতারণা ২২০টি এবং ফেসবুক ও জিমেইল হ্যাকের ৯৮টি অভিযোগ।

এর মধ্যে দুটি মোবাইল ফোন, হ্যাক হওয়া ১৫টি ফেসবুক আইডি, ৭টি জিমেইল আইডি উদ্ধার করা হয়েছে। ২৭৩ জন ভুক্তভোগীকে সাইবারসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ২৯০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করেছে ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিটের উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ। সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের এক কর্মকর্তা বলেন, লুট হওয়া, চোরাই বা অবৈধ মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার, অপপ্রচার, গুজব, উসকানিমূলক প্রচারণা, ব্যক্তির চরিত্রহরণ, প্রতারণা ও ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগ বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা ইমো হ্যাক হচ্ছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগে সাইবার অপরাধীরা অনলাইনে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে গঠন করা হয়েছে ‘রিকভারি রেঞ্জার টিম’। একজন এডিসির নেতৃত্বে এই টিমের সদস্য সংখ্যা ১৪।

আইডি হ্যাক ও প্রতারণায় নিত্যনতুন ফাঁদ : রহুল আমিন নামে ঢাকার এক আইনজীবীর হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিঙ্ক আসে। সেখানে ক্লিক করতেই তার ফেসবুক আইডি হ্যাকসহ মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় হ্যাকাররা। তিনি কোনো উপায় না পেয়ে ডিবির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে আসেন। সাইবার পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে তার আইডির নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয় এবং ফেসবুক আইডি উদ্ধার করে দেয়। যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে সরকারি চাকরিজীবী তাসলিমা বেগমের স্মার্টফোনটি হারিয়ে যায়। এ বিষয়ে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় একটি জিডি করেন। গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি ডিবির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারে আসেন। মোবাইল ফোনে তার ফেসবুক আইডি লগইন অবস্থায় ছিল।

এছাড়া মোবাইলে অসংখ্য ছবি, ভিডিও এবং গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ছিল। তিনি নতুন স্মার্ট মোবাইল ফোন কিনলেও ফেসবুকে লগইন করতে পারছিলেন না। সাইবার পুলিশ তার অ্যাকাউন্ট উদ্ধার করে দেয়। পাশাপাশি অল্প কিছুদিনের মধ্যে তার মোবাইল ফোনটিও সিরাজগঞ্জ থেকে উদ্ধার করে দেওয়া হয়। হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে রুহুল আমিন ও তাসলিমা বেগম দ্রুত সময়ের মধ্যে সাইবার সেবা পেলেও মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে পুলিশের তেমন সক্ষমতা না থাকায় পর্যাপ্ত সেবা দিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিবির সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের ডিসি মো. শাহরিয়ার আলম জানান, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের সেবাই এখান থেকে দেওয়া হচ্ছে। সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের নিজস্ব ফেসবুক পেজ রয়েছে। সেখানে সাইবারসংক্রান্ত সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাইবার সাপোর্ট সেন্টারের হটলাইন (০১৩২০২০২০২০) রয়েছে। কেউ সাইবার মাধ্যমে হেনস্তা বা প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের সভাপতি কাজী মুস্তাফিজ বলেন, সাইবার মাধ্যমে নিরাপদ থাকতে টু-ফ্যাক্টর বা মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি চালু থাকলে শুধু পাসওয়ার্ড জানলেই কেউ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারে না। এ ছাড়াও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, সফটওয়্যার আপডেট রাখা ও ফিশিং লিংক থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD