বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ধানমন্ডির এপেক্স ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস মহাখালী টোবাকো ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ারের ৩ ইউনিট জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক যুদ্ধবিমান শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ফিলিপাইনে ফেরিতে আগুন লেগে নিহত ৫, নিখোঁজ ৮৭ রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে ৩৭০০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি খলিলুর রহমানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এসএসসির খাতা পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ, ফেল থেকে পাশ ৪৫৮৫ আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার কারণ জানাল দুদক যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা, ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টিতে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপ

শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খেলাপিযোগ্য অনেক ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। সরকার পতনের পর ওই সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণই চার লাখ ৩৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২.৭৪ শতাংশ। Government

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় এর প্রভাব ছিল বেশি। এসব ব্যাংক সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে ওই ঋণের অর্থ আর ব্যাংকে ফিরে আসছে না। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত দেখানোর যে সুযোগ ছিল, সেটিও বন্ধ হয়েছে। ফলে গোপন থাকা অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এসব কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

পরিমাণের দিক থেকে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের। ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২.১৫ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়। এর বড় একটি অংশ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

তথ্যানুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট খেলাপির ৬২ শতাংশ।

ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, মূলত ঋণগ্রহীতাদের অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা ও সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারার কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বিভিন্ন কারণে অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। এক বা একাধিক কিস্তি বকেয়া হলে নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঋণ শ্রেণিকৃত করা হচ্ছে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ শতাংশ। একসময় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই ব্যাংক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যানটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থার্মেক্স গ্রুপের ঋণসংক্রান্ত নানা অনিয়মের কারণে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক খেলাপি ঋণের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭.০৮ শতাংশ।

এরপর সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এক্সিম ব্যাংকে। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৫৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭০.৮১ শতাংশ। বিগত সরকারের সময়ে ব্যাংকটি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বাংলাদেশসংবাদ

শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় এরপর রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৩.৯৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৮.১৫ শতাংশ। ব্যাংকটিও একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩.৩৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের হাতে। বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়।

ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৫.৭৪ শতাংশ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে চলে যায়। এরপর থেকে ব্যাংকের অবস্থা দুর্বল হতে থাকে।

ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬.৭৮ শতাংশ। দশম অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা ৫৬ শতাংশ।

ঋণখেলাপিদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমছে না। বরং গত জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরো প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে গত দুই বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি, মামলা করে অর্থ আদায় এবং সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে স্বল্পসুদে অর্থায়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এত সুযোগ-সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ কমার বদলে বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার সময়সীমা শিথিল করতে চাচ্ছে। আবার এক হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে খেলাপি ঋণ কমেনি; বরং আরো বেড়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এখন এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার কারণে ব্যাংক খাত আরো সংকটে পড়ে। উন্নতি করতে না পারলেও অন্তত ‘ডু নো হার্ম’ নীতি অনুসরণ করা উচিত।

জাহিদ হোসেন বলেন, একই ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ায় বাজারে ভুল বার্তা গেছে। আবার অযোগ্য ঋণগ্রহীতাদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান রক্ষার যুক্তিতে ব্যাংকব্যবস্থার মাধ্যমে অযোগ্য ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন না করে যাদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তাদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া উচিত।

তিনি আরো বলেন, এ ধরনের নীতির কারণে বড় ঋণখেলাপিরা মনে করতে পারেন, ঋণ পরিশোধ না করলেও ভবিষ্যতে আবার ছাড় পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও মনে করতে পারে, তারল্য বা মূলধন সংকটে পড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংক শেষ পর্যন্ত জরুরি সহায়তা দিয়ে তাদের রক্ষা করবে।

সূত্র : আমার দেশ

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD