যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তারা টানা ১১তম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান এই হামলার কারণে পাকিস্তারের মধ্যস্থতায় ভেঙে পড়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রায় ভেস্তে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সর্বশেষ হামলায় কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানায়নি। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে হামলার তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে।
নতুন হামলার আগে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি পাকিস্তর সফর করেন। পাকিস্তান এই সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে যুদ্ধ বন্ধে কী ধরনের নতুন সমঝোতা হতে পারে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এ মুহূর্তে বৈঠকে কোনো আগ্রহ নেই।’ তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে, শিগগিরই ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোর একটি সংলগ্ন পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় হামলা চালানো হতে পারে।
আলোচনা স্থবির হয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে উভয় পক্ষই সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।
মার্কিন হামলার পরও ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
মঙ্গলবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা করে, ফলে নাবিকদের জাহাজ ত্যাগ করতে হয়। পাশাপাশি ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপরও হামলা চালিয়ে যায়। বাহরাইন ও কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা সাইরেন বেজে ওঠে।
এই উত্তেজনার ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারের বেশি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন সাধারণ পেট্রলের গড় মূল্য ৪ ডলারে পৌঁছে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটি জনসমর্থন হারাচ্ছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং নতুন মার্কিন সেনা হতাহতের কারণে জনগণের অসন্তোষ বাড়ছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান যুদ্ধে আহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ৫০০-এরও বেশি। যদিও পেন্টাগনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী আহতের সংখ্যা ৪৮২। ওই কর্মকর্তা জানান, সরকারি তথ্য হালনাগাদ হতে কিছুটা সময় লাগে।
এদিকে লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য নতুন হুমকি সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় সৌদি আরব লোহিত সাগরে তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইন ব্যবহার করছে।
হুথিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনি বার্তা সংস্থা সাবা (সাবা) দাবি করেছে, তাদের সতর্কবার্তার পর ছয়টি জাহাজ লোহিত সাগরে তাদের পথ পরিবর্তন করেছে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
হুথি কর্মকর্তারা জানান, তারা আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে বাব আল-মান্দেব প্রণালী এড়িয়ে চলার সতর্কতা দিয়েছে।
ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। শরিফ এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
পাকিস্তান গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তির মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং আবারও উভয় পক্ষকে আলোচনায় ফেরানোর চেষ্টা করছে।
ট্রাম্প বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা ‘মরিয়া হয়ে বৈঠক করতে চান’, কিন্তু তারা অর্থবহ আলোচনার জন্য প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নেই।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হলে সেটিকে যুদ্ধের বড় ধরনের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র ও সমর্থকদের স্বার্থে শক্তিশালী হামলা চালানো হবে।
মঙ্গলবার সেন্টকম জানায়, তারা ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, নৌ সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ফার্স, হরমোজগান, ইলাম, কেরমান এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএমটিও) জানায়, ওমান উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর নাবিকদের জাহাজ ত্যাগ করতে হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
এদিকে জর্ডান জানিয়েছে, ইরান তাদের লক্ষ্য করে পাঁচটি ড্রোন ও তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, তবে সবগুলোই ভূপাতিত করা হয়েছে। বাহরাইনেও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করা হয়।
ইরাকের এরবিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার আশঙ্কায় সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয়। কুয়েত জানিয়েছে, টানা চতুর্থ দিনের মতো তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টে হামলা হয়েছে। কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানীয় জল এসব প্ল্যান্ট থেকে আসে, তাই এসব হামলা দেশটির জন্য অত্যন্ত গুরুতর।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিদ্যুৎ ও পানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলাকে “অগ্রহণযোগ্য” এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাগুলো একটি চলমান সংঘাতের অংশ। বিভিন্ন পক্ষের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হতে পারে এবং পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি