রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে আগের প্রকল্পে ভবন নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় বাতিল হয়েছে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকার বিশ্বব্যাংকের ঋণ।
এমনকি কেন্দ্র দুটি পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অংশীদার নিয়োগের উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকার আরো একটি ঋণনির্ভর প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। ফলে পুরনো প্রকল্পের দুর্বলতা কাটানোর আগেই নতুন বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তৈরি পোশাকের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভরতা কমিয়ে চামড়া, পাদুকা, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্য-প্রযুক্তি, পাট, ওষুধ, আসবাবসহ সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানি বাড়াতে ‘ডিপেনিং এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন’ প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পুরো অর্থই বিশ্বব্যাংকের ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব এবং আগের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস’ প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন প্রকল্পের একটি বড় অংশই আগের প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ব্যয় হবে। ২০১৭ সালে নেওয়া এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো।
এ জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, পরীক্ষাগার, মান যাচাই ও সনদ সুবিধা এবং দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্পটির আওতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একটি চামড়া ও পাদুকা খাতের জন্য ‘ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার’ এবং অন্যটি প্রকৌশল খাতের ‘সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’। ভবন নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি।
সরকারি নথি অনুযায়ী, যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনের পর ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি দুটি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়। ১২ মার্চ দরপত্র মূল্যায়ন শুরু হলেও ঠিকাদার নির্বাচন, চুক্তি, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়নি।
এ অবস্থায় প্রকল্পের ঋণের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল সরকার; কিন্তু বিশ্বব্যাংক তাতে সম্মতি দেয়নি। ফলে প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় তিন কোটি ১৫ লাখ ডলার বা ৩৮৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ঋণ বাতিল হয়ে যায়। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্রও বাতিল করতে হয়।
সমস্যা ছিল পরিচালনকাঠামো নিয়েও। কেন্দ্র দুটিকে পেশাদারভাবে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদার নিয়োগের পরিকল্পনা ছিল। এ বিষয়ে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান প্রোডাক্টিভিটি সেন্টারের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছিল; কিন্তু ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেই উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
এবার নতুন প্রকল্পে কালিয়াকৈরের ওই দুই কেন্দ্র সচল করতে তিন কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আরো দুটি প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন দুই কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে ছয় কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং যন্ত্রপাতি ও সক্ষমতা তৈরিতে চার কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ চার প্রযুক্তি কেন্দ্রের পেছনেই ব্যয় হবে মোট ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার। নতুন প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর আওতায় চামড়া-পাদুকা, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মাছ-চিংড়ি, হস্তশিল্প, তথ্য-প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, পাট, মানবসৃষ্ট তন্তু, ওষুধ ও আসবাব খাতকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।