শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৬:০২ পূর্বাহ্ন

অথৈ জলের দুঃখগাথা ২০ লাখ বাসিন্দার

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২৩ জুন, ২০২১

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : থৈ থৈ পানিতে চলছে নৌকা, চলছে পানির রিজার্ভ ট্যাংকি বাঁচাতে ইট-সিমেন্ট নিয়ে দিন-রাত বৃথা চেষ্টা। কেউ বাড়ির আঙিনায় ‘ঝাঁকি জাল’ দিয়ে মাছ ধরছেন, অনেকে সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে বাড়ির চারপাশে লাগাচ্ছেন কারেন্ট জাল।

অনেকে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন ডাইংয়ের কেমিক্যাল মিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি থেকে বাঁচতে কিংবা পানিতে সুয়ারেজের লাইন ও রান্নাঘরের চুলা ডুবে যাওয়ার কারণে। ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই শুধু পানি, কোথাও কোমর সমান আবার কোথাও শোবার ঘরের খাট ছুঁই ছুঁই। সেখানে বাথরুম ডুবে থাকার কথা যেন বলাইবাহুল্য।

সেই সঙ্গে ডুবে আছে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তা-ঘাট, মসজিদ-মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,খেলার মাঠসহ সব কিছুই। এমন চিত্র প্রায় ২০ লাখ মানুষের আবাসস্থল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ অভ্যন্তরের। এখানকার বাসিন্দাদের বাস্তব অবস্থা যেন আরও বেশি ভয়ঙ্কর।

গত কয়েক দিনের ভারিবর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এখানে সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম বন্যা। এ অসহনীয় দুর্ভোগ ও ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে একদিকে চলছে হাহাকার অন্যদিকে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ।

ডিএনডির জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের কাজ চলমান থাকার পরেও কেন এই দুর্ভোগ- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ।

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড আর ডিপিডিসির রশি টানাটানি আর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরদারির অভাবেই ভোগান্তিতে পড়েছেন ডিএনডিবাসী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরও জুনের মাঝামাঝি ভারিবর্ষণের কারণে ডিএনডি এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়েন বাসিন্দারা। ওই সময় স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের অনুরোধে ডিএনডি মেগা প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর ১৯ ইসিবির কর্মকর্তারা সেকেন্ডে ৪ হাজার লিটার পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতাসম্পন্ন ২টি শক্তিশালী পাম্প চালু করে পানি নিষ্কাশন শুরু করেন।

মূলত মেগা প্রকল্পের আওতায় যে ৭টি পাম্প ক্রয় করা হয়েছিল সেগুলো স্বয়ংক্রিয় হলেও পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে গত বছরের ১৯ জুন ম্যানুয়ালি জেনারেটরের মাধ্যমে চালু করা হয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই ডিএনডির পানিবন্দি অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছিল। চলতি বছর সেই শক্তিশালী পাম্প দুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের পুরনো একটি ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে বিদ্যুতের সাহায্যে চলমান রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রজেক্টে কর্মরত একজন সদস্য জানিয়েছেন, এ বছর টানা বর্ষণের কারণে পানির পরিমাণ অনেক বেশি। পুরনো ট্রান্সফরমারের পাশাপাশি আমরা একটি ট্রান্সফরমার ভাড়ায় এনেছিলাম জলাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে; যাতে পুরোপুরিভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে আমরা ৭টির মধ্যে কমপক্ষে ৫টি পাম্প এখনই চালু করতে পারি। কিন্তু ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ না নেয়া পর্যন্ত সেই সুযোগ দিবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। আমরা লাখ লাখ মানুষের দুর্দশার বিষয়টি সামনে এনে অন্তত ২ সপ্তাহের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ চাইলেও তারা সেটি মানেনি। ফলে ওই ট্রান্সফরমারটি আমাদের ফেরত দিতে হয়েছে।

এদিকে মঙ্গল ও বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল, পাইনাদী নতুন মহল্লা, ধনুহাজী রোড, পাগলাবাড়ি, মিজমিজি, বাতানপাড়া, কদমতলী, কান্দাপাড়া, সাহেবপাড়া, সানারপাড়, নিমাইকাশারী, পাঠানটুলি, গোদনাইল, ধনকুন্ডা, জালকুড়ি, তালতলা, আদর্শনগর, বাঘমারা, মৌচাক, ঢাকার ডেমরা, শনিরআখড়া, কুতুবখালি, ফতুল্লার ভুইগড়, দেলপাড়া, লালপুর, পৌষাপুকুর, সস্তাপুর, লালখাঁ, ওয়াপদারপুল, উত্তর মাসদাইর, তুষারধারা, লামাপাড়া, রামারবাগ, নয়ামাটি, কুতুবপুর, পাগলা চীতাশাল এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে কৃত্রিম বন্যা। এতে কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

সিংহভাগ এলাকার বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় বদ্ধ পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে।

মঙ্গলবার ও বুধবার সরেজমিন শিমরাইলের পাম্প হাউসে গিয়ে দেখা গেছে, ওই পাম্প হাউসের পুরনো ৪টি পাম্পের মধ্যে ৩টি পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। একটি পাম্প দীর্ঘদিন যাবত নষ্ট।

এ ব্যাপারে ডিএনডি প্রজেক্টের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পানি নিষ্কাশনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো নিষ্কাশনের শাখা খালগুলো সংস্কার করার পর আবার ময়লা আবর্জনা ফেলে ভরে ফেলা। অনেক স্থানে আমরা খাল পুনরুদ্ধার করেছি, নতুন খাল খনন করেছি। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই সেগুলো আবার ময়লা দিয়ে স্থানীয় লোকজন ভরে ফেলেন। ফলে শাখা খাল দিয়ে মূল ক্যানেলে পানি আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

তিনি আরও বলেন, ডিএনডি প্রকল্পের আওতাধীন ডিএনডির নিজস্ব জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা ৪০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে; যা উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক আইনি জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি তিতাস, ডিপিডিসিসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ভূ-গর্ভস্থ পাইপ লাইনগুলোও সরানো হয়নি, ফলে আমরা অনেক স্থানেই অবকাঠামোগত কাজ করতে পারছি না।

তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থ সংকটে পড়েছে ডিএনডির এই মেগা প্রকল্পটি। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ প্রকল্প বাবদ ৩৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ের কার্যক্রম পরিকল্পনা করা হলেও ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পের কর্মপরিকল্পনা থাকলেও অর্থ সংকটে অধিকাংশ চলমান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

কার্যক্রম চলাকালীন প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৪১.৫৫ শতাংশ। প্রকল্পে সম্পাদিত ১০ শতাংশ কাজের বিল; যার অর্থমূল্য ১১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদাররা বিল না পেয়ে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করে রেখেছে। এছাড়াও প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রকল্পের বিদ্যমান উপযোগসমূহ স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ধারাবাহিকতায় প্রকল্পের খাল পুনঃখননসহ আরসিসি ব্রিজ, কালভার্ট ও ক্রস ড্রেনের নির্মাণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওই সূত্র।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর এ প্রকল্পের কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনস্থ ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন। এর আগে, প্রথম ধাপে ২০১৬ সালে একনেকের সভায় ডিএনডি প্রকল্পের জন্য ৫৫৮ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প পাস হয়। পরবর্তীতে ডিএনডি এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম সংশোধনীতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সূত্র : যুগান্তর

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD