রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন

কোটি কোটি টাকা মালিক বনে গেছেন গণপূর্তের ‘মাসুদ’ দুর্নীতিতে শীর্ষে

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদফতরের নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা। বিগত আওয়ামী শাসনামলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি, বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগের আমলে দুর্নীতিবাজ দলবাজ কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছে মাসুদ রানার নাম। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা গণপূর্তের মিস্টার ১৫% (কার্যাদেশের ১৫ শতাংশ ঘুষ আদায় অর্থে) হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেনে বলে জানাযায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ থাকা অবস্থায় তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।
বর্তমানে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ -৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এখানেও যথা পূর্ব তথা পরং অর্থ্যাৎ পূর্বের মতই অনিয়ম দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মিরপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। দমানোর জন্য আওয়ামী লীগের এমপি মাঈনুল হোসেন খান নিখিলের মাধমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। এছাড়া, তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত অর্থ দিতেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানাগেছে। এনিয়ে শেরে বাংলা নগর থানার সামনে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করেছিলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঐ সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্যে দাবি তোলা হয়েছে।
নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ হোসেন ডিলুর মাধ্যমে রাজশাহী থেকে ঢাকায় বদলী হয়ে আসেন। বনে যান প্রতিমন্ত্রীর একান্ত লোক। তাকে সব রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গণপূর্তের অঘোষিত ‘রাজা’ বনে যান। এরপরই তার ডিভিশনে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ হতে থাকে। আর কাগজ কলমে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখিয়ে লুটে নেন কোটি কোটি টাকা।
সূত্রমতে, সাবেক মন্ত্রী আওয়ামী দোসর শরীফ হোসেন ডিলুর ইচ্ছায় রাজশাহী থেকে তাকে বদলী করে ঢাকায় আনা হয়। এরপর পদায়ন করা হয় ঢাকা শেরে বাংলা নগর-৩ নং ডিভিশনে। সেখান থেকে লুটপাট করার পর সাবেক মন্ত্রী র আ ম উবায়দুর মুক্তাদুরের আমলে বিশেষ তদবীরে ঢাকা-৪ ডিভিশনে পদায়ন পান। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে তিনি ৫ বছর চাকুরী করেছেন। এসব ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থেকে অবৈধ পথে আয় করেছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। আর সে সব টাকায় হাতের মুঠিতে ধরে রেখেছেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীকে। কথিত আছে যে, যখন যে মন্ত্রী, সচিব ক্ষমতায় আসেন তখনই সেই মন্ত্রী, সচিবের একান্ত লোক বনে যান প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা।

এ ছাড়াও তিনি সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তার ‘ক্যাশিয়ার’ বা অর্থ সংগ্রাহক হিসেবেও তিনি পরিচিতি পান সেসময়ে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতারকে নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন। যে কারণে ঢাকার বাইরে তার বদলী হয়নি। ঘুরে ফিরে ঢাকা ডিভিশনের মধ্যেই রয়েছেন গত ৫ বছর। অথচ: ৫ আগষ্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হলে সরকারী সমস্ত দপ্তরে ব্যাপক রদবদল করে আওয়ামী সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি রাজশাহী ডিভিশনের লোক হওয়ায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসর বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দীন চুপ্পুর সাথেও বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তার বাসায় ঘনঘন যাতায়াত করেন। তার ক্ষমতার প্রভাবও বিস্তার করেছেন গণপূর্তে। জুলাইয় ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র জনতার বিরুদ্ধে থাকা এই নির্বাহী প্রকৌশলী গণপূর্তের ঠিকাদার মহলে মিস্টার ১৫% রানা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত।

বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা রাজনৈতিক ভোল পাল্টে কৌশলে নিজেদের আড়াল করে এখনো দাপট বজায় রেখেছেন। এমন এক আলোচিত নাম নগর গণপূর্ত বিভাগ ঢাকা-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্য ভুয়া টেন্ডার, অতিরিক্ত বিল দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এখন উত্তাল গণপূর্ত অধিদপ্তরে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক প্রকৌশলী অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ শাস্তি পেলেও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা ঢাকায় দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছেন।

সূত্রে জানাগেছে, মাসুদ রানার দুর্নীতির কৌশল ছিল বহুমুখী। টেন্ডার চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম কমিশন নেওয়া, কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিল উত্তোলন এবং অস্তিত্বহীন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, তার নির্ধারিত কমিশন ছাড়া কোনো বিল পাশ করা প্রায় অসম্ভব ছিল।

জানাগেছে, তিনি শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩ কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন প্রভাবশালী সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মাসুদ রানার ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়। এরপর তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।

আরও জানাযায়, দুর্নীতির দায়ে তাকে কয়েকবার বদলি করা হলেও অদৃশ্য শক্তিবলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। অনেকের মতে, এই প্রকৌশলীর প্রভাবের কাছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও যেন অসহায়।

সম্পদের পাহাড়: গুলশান থেকে মোহাম্মদপুর অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে মাসুদ রানা গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার সম্পদ। তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের যে তালিকা পাওয়া গেছে তা পিলে চমকানোর মতো:
গুলশান: ঘনিষ্ঠ এক ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রাপ্ত একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। বনশ্রী: ডি-ব্লকে (বাসা নং ৫৪/ডি) ৫ তলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা। এছাড়া এফ-ব্লকের মোল্লা ম্যানশনে স্ত্রীর নামে আরও দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা সিটি: বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলায় (বি ব্লক) দুটি মূল্যবান দোকান। মোহাম্মদপুর: বাবর রোডে (রোড-৯, বাসা-১৮৯/এ) নিজের নামে ১০ কাঠার একটি বিশাল প্লট, যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি।

এছাড়া মোহাম্মদপুর ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি থাকার তথ্য উঠে এসেছে। প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে অধিদপ্তরে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তার অফিসে কয়েক বার গেলে তাকে পাওয়ায় যাইনি। পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য দেওয়া যায়নি।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD