সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তার অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থাকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করবে। Politics
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সরকারি চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে চরম দলীয়করণ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় বিবেচনায় মেধাহীন, অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব জায়গায় মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে অন্ধ দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। অথচ সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন একটি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মেধার মূল্যায়নকে দুর্বল করবে। এতে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির পথ খুলে যাবে।
তিনি বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০ নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশবাসী মনে করে, ভাইভার নম্বর বড় আকারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রশাসনকে দলীয়করণের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের নগ্ন হাতিয়ার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লিখিত পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, মেধা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও অডিট করা সম্ভব। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন অনেকাংশেই বোর্ডের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল।
তার ভাষ্য, ভাইভার নম্বরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হলে মেধার ব্যবধান কৃত্রিমভাবে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন ঘটবে। যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।
তিনি বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদগুলোতে দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী প্রতিযোগিতা করেন। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নেন এবং সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মেধা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন এমন কোনো অনিশ্চিত ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়, যেখানে মৌখিক পরীক্ষার অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল সহজেই উল্টে দেওয়া সম্ভব।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রক্সি, জালিয়াতি ও পরীক্ষায় অনিয়ম প্রতিরোধ করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু জালিয়াতি বন্ধের অজুহাতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, অতীতে সরকারি চাকরি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের যে ভয়াবহ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ তার অবসান চেয়েছে। সরকারের দায়িত্ব সেই গণআকাঙ্ক্ষা ধারণ করা। নতুন কোনো পদ্ধতিতে পুরোনো দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করা নয়।
তাই নিয়োগব্যবস্থার এমন কোনো পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা ভবিষ্যতে প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যশীল জনবল প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, তারা এমন একটি প্রশাসন চান, যেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিচয় হবে তার মেধা, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতা। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকেই সর্বপ্রথম স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। Politics
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য, আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত সুপারিশ কিংবা অর্থের প্রভাবের কোনো স্থান থাকতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নিয়োগ হতে হবে মেধা, যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থের লেনদেন ও সুপারিশের সংস্কৃতি বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শতভাগ স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে পুরোনো বৈষম্য, দলীয়করণ ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি জনগণ মেনে নেবে না। তরুণ সমাজের মেধা, শ্রম ও ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
দেশের চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, মেধার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যের অবসান এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই হতে হবে নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।