সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরায়েল। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোরে বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে অন্তত আটটি বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
তবে, হামলায় রানওয়ে ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তুরস্কের সীমান্ত থেকে মাত্র ৪৫ মাইল দূরে এই ঘাঁটির অবস্থান।
এ ঘটনাকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে তীব্র সমালোচনা করেছে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সম্প্রসারণবাদী নীতির কঠোর নিন্দা জানিয়েছে তুরস্ক।
অস্বাভাবিক এই হামলার ফলে ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ ইসরায়েল প্রথমে হামলার দায় অস্বীকার করে। হামলার প্রায় ২০ ঘন্টা পর নিজেদের করা হামলার তথ্য প্রকাশ করে নেতানিয়াহু প্রশাসন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) এই হামলা চালিয়েছে বলে তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, হামলাটি ইসরায়েলই চালিয়েছে।
ব্যারাক বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এ ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এবং হামলাটিকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কোনো অবদান রাখে না।
এ হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে ইসরায়েলি সরকার জানিয়েছে, আলেপ্পোর কাছে বিমানঘাঁটিতে তুরস্ককে সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে করা চুক্তি লঙ্ঘনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল সিরিয়া। এ হামলার লক্ষ্য ছিল ওই এলাকায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি ঠেকানো।
ইসরায়েলি বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের মোতায়েন ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে-এ বিষয়ে সিরিয়াকে বারবার সতর্ক করেছে ইসরায়েল। তবে, এসব সতর্কতা উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিরিয়া। ইসরায়েল তার নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি সহ্য করবে না এবং আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়াকে স্বাগত জানাবে।
একটি সূত্র জানায়, বিমানঘাঁটি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগের বিষয়টি সিরিয়ার সরকার আগে থেকেই জানত। রানওয়ে পুনর্নির্মাণের কারণ ব্যাখ্যা করে এবং এর কোনো শত্রুতামূলক উদ্দেশ্য নেই বলে ইসরায়েলকে বার্তাও পাঠিয়েছিল সিরিয়া।
হামলার নেপথ্যে আসল ঘটনা
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, হামলার আগে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে অবহিত করেছিল ইসরায়েলি সরকার।
হামলার প্রায় তিন ঘণ্টা আগে ফোনে এরদোয়ানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তবে ওই আলোচনায় বিমানঘাঁটির বিষয়টি উঠেছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েল হোয়াইট হাউসকে জানিয়েছিল, হামলার উদ্দেশ্য ছিল তুরস্ককে বিমানঘাঁটিতে অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার একটি চালান পাঠানো থেকে বিরত রাখা এবং ওই ঘাঁটিতে বৃহত্তর সামরিক উপস্থিতি ও সক্ষমতা গড়ে ওঠা ঠেকানো।
তবে, এক তুর্কি কর্মকর্তা ইসরায়েলের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের কোনো উপস্থিতি ছিল না। প্রতিবেশী দেশগুলোতে বোমা হামলা ও অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার জন্য ইসরায়েল অজুহাত তৈরি করছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে একটি চুক্তি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিল সিরিয়ার সরকার। ওই চুক্তির আওতায় জর্ডানে একটি যৌথ সমন্বয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকানো এবং এমন আকস্মিক হামলা এড়ানো।
ওই কর্মকর্তা বলেন, একই চুক্তির অংশ হিসেবে দুই দেশ সামরিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু সমন্বয় কেন্দ্রটি কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায় ইসরায়েল। এর পরিবর্তে দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) অনুপ্রবেশ আরও বাড়ায়।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, একপর্যায়ে সিরিয়ার সরকার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে শুরু করে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে।
এ ঘটনার পর সিরিয়ার সরকারকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিষয়টি মোকাবিলা করা সহজ হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন কর্মকর্তারা।
এদিকে, কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইসরায়েলের অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনও এই হামলার পেছনে আংশিকভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।