বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৭ অপরাহ্ন

বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয়

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী, ২০২৬

‘বিয়ের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল’ শুনলেই অনেকের মনে প্রশ্ন, দ্বিধা কিংবা অস্বস্তি তৈরি হয়। আমাদের সমাজে এখনো এটি মূলত বিয়ের পরের একটি বিষয় হিসেবেই ভাবা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিছু নারীর ক্ষেত্রে বিয়ের অনেক আগেই শারীরিক জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল গ্রহণ জরুরি হয়ে ওঠে। বিষয়টি গোপনীয়তা, ভয় কিংবা ভুল ধারণার আড়ালে পড়ে গেলেও এর সঙ্গে নৈতিকতা নয়, জড়িয়ে আছে সরাসরি নারীর স্বাস্থ্য ও সুস্থ জীবনযাপন।

অনিয়মিত পিরিয়ড, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, তীব্র ব্যথা কিংবা হরমোনজনিত সমস্যার সমাধান হিসেবে বিয়ের আগেই জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত হন, আবার কেউ কেউ অযথা দুশ্চিন্তায় ভোগেন ভবিষ্যৎ মাতৃত্ব নিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয় তাদের জন্য বাস্তবভিত্তিক, চিকিৎসা–সমর্থিত তথ্য জানা এখন সময়ের দাবি। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল।

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল মানেই শুধুমাত্র গর্ভধারণ রোধ করা। বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিলকে বিভিন্ন হরমোনজনিত সমস্যার চিকিৎসা হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বিয়ের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়াকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়, বরং চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখা উচিত।

বিয়ের আগে কেন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হতে পারে?
পিরিয়ড অনিয়মিত হলে: অনেক কিশোরী ও তরুণীর মাসিক সময়মতো হয় না, কখনো খুব দেরিতে হয়, আবার কখনো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। এই অনিয়ম শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল হরমোন নিয়ন্ত্রণে এনে মাসিককে নিয়মিত করতে সাহায্য করে।

পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত ব্যথা: পিরিয়ডের সময় তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা এসব সমস্যায় অনেকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিল ব্যবহার করলে ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস): পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের মাসিক অনিয়ম, মুখে ব্রণ, অতিরিক্ত লোম এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা যায়। এই ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল একটি কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা: অনেক নারীর মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়, যা ধীরে ধীরে রক্তস্বল্পতা তৈরি করে। পিল পিরিয়ডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

বিয়ের আগে পিল খেলে ভবিষ্যতে সন্তান নিতে সমস্যা হয় কি?
এটি সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি। এ বিষয়ে অধ্যাপক কাজল স্পষ্ট করে বলেন, চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময় জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণে কোনো সমস্যা হয় না। পিল বন্ধ করার পর সাধারণত স্বাভাবিক ডিম্বস্ফোটন আবার শুরু হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক মাসের মধ্যেই গর্ভধারণ সম্ভব হয়।

নিজে নিজে পিল খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা। অনেকেই পরিচিতজনের পরামর্শে বা ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে পিল কিনে খান, যা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। ভুলভাবে বা দীর্ঘদিন পিল খেলে হতে পারে- মাথাব্যথা, বমিভাব, ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি (বিশেষ ক্ষেত্রে)। তাই বিয়ের আগে বা পরে যেকোনো সময় পিল গ্রহণের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সামাজিক সংকোচ বনাম স্বাস্থ্য সচেতনতা
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিলের কথা বলতেই অনেক নারী সংকোচবোধ করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি লজ্জার নয়, বরং নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন থাকার একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজলের মতে, স্বাস্থ্য সমস্যা গোপন রাখার চেয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়াই একজন নারীর ভবিষ্যৎ সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি তৈরি করে।

বিয়ের আগে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল নিয়ে ভয়, লজ্জা বা ভুল ধারণার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজন হলে সঠিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই একজন নারীর সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের প্রথম ধাপ। স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্তই পারে ভবিষ্যতের জটিলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD