বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে ভারত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে, পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলন ঘিরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা থাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার। মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দেশটির মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশে চলমান বিভিন্ন ঘটনা ও পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। একই সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী ধারায় এগিয়ে নিতে চায় নয়াদিল্লি।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনুসরণ করছি। সেখানে নানা পরিবর্তন বা ঘটনা ঘটছে এবং আমরা তা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মতো সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করতে চাই।’
সীমান্তবর্তী নদ-নদী ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ভারতের মুখপাত্র জানান, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মতো বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মাধ্যমেই আন্তঃসীমান্ত নদীসংক্রান্ত আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে ভারত সফরের জন্য আগে দেওয়া আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে পরবর্তী সময়ে জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন জয়সোয়াল।
এদিকে, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকার পোশাক কারখানা আংশিকভাবে চালু হলে অনেক শ্রমিক কাজে যোগ দিতে যান। তবে কিছুক্ষণ পরই তাঁদের একটি অংশ কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে অবস্থান নিলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
শিল্পাঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করছে বিজিবি। বিশেষ করে সংবেদনশীল সড়ক ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর দাবি, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিল্পপতি ও কারখানার মালিক শ্রমিক অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিযুক্তদের অনেকেই অতীতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এসব শিল্পপতির আন্দোলনে উসকানিমূলক ভূমিকার বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, মহাসড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ করে শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের পর্যবেক্ষণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে ঢাকা, অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে নয়াদিল্লি। সূত্র: এএনআই