মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবের পাশাপাশি নানা সংকটের কারণে ব্যাংক খাতে প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একযুগ পর প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ায় অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে চতুর্থ প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক। তবে নতুন এ ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু সক্ষম হবে তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হবে বলে প্রত্যাশা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। তারা বলছেন, ব্যবসায়িক গ্রোথ ভালো থাকায় এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতায় বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৩০টি ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) ২৯টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত রয়েছে। আর এনআরবিসি ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে ডিএসই ও সিএসইতে আরও একটি করে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়বে।
এর আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। আইপিও’র মাধ্যমে ১১৫ কোটি টাকা অর্থ সংগ্রহ করেছিল ব্যাংকটি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেসব ব্যাংক ভালো অবস্থানে ছিল, সেগুলো এখন খারাপ অবস্থায় চলে এসেছে। যেহেতু বিএসইসি এনআরবিসি ব্যাংককে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে, তাই ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন আরও যাচাই করে দেখা উচিত।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এনআরবিসি ব্যাংক ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে ১০ টাকা ফেসভ্যালুতে মোট ১২ কোটি শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজারে থেকে ১২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ব্যাসেল-৩ শর্ত পরিপালনে ১১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে সরকারি সিকিউরিটিজে। সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে পুঁজিবাজারে। বাকি সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে আইপিও প্রক্রিয়ায়।
বর্তমানে এনআরবিসি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৫৮২ কোটি টাকা। আইপিও পরবর্তীতে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দাঁড়াবে ৭০২ কোটি টাকা। গত ৫ বছরের ভারিত গড় হিসাবে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ১.৫৫ টাকা।
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে সমাপ্ত বছরের হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দেখানো হয়েছে ২.০২ টাকা। এর আগের বছর একই সময়ে ইপিএস ছিল ১.৮২ টাকা। আর ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর (তৃতীয় প্রান্তিক) পর্যন্ত ইপিএস দাঁড়য়েছে ৩.৩৭ টাকায়। ৩০ জুন (অর্ধবার্ষিক) পর্যন্ত ইপিএস ছিল ০.৬২ টাকা। এছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ১৬ টাকা। আর ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকের এনএভি (সম্পদ পুনঃমূল্যায়ন ব্যতীত) ছিল ১৩.৮৬ টাকা।
এ বিষয়ে এনআরবিএসি ব্যাংকের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট জাফর ইকবাল হাওলাদার বলেন, চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে এনআরবিসি ব্যাংক প্রথম শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ব্যাংকটির বিজনেস গ্রোথ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, এনআরবিসি ব্যাংক বিজনেস ডাইভার্সিফিকেশন ভালো করেছি। ফলে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ রিকোভারি রয়েছে। তাই ব্যাংকের তারল্যের ঘাটতি নেই। এনআরবিসি ব্যাংকের ফান্ড ও ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট যথেষ্ট শক্তিশালী। ছোট ব্যাংক হিসেবে আমাদের সরকারি সিকিউরিটিজে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। সার্বিক দিক থেকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা যথেষ্ট আন্তরিক।
এনআরবিসি ব্যাংক আইপিও প্রক্রিয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি হতে চললেও চতুর্থ প্রজন্মের আরও ৮টি ব্যাংক অতালিকাভুক্ত রয়েছে। ওই ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর ৩ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। বরং লোকসানসহ নানাবিধ কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো প্রতিনিয়তই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময়ের আবেদন বাড়িয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে বিদেশি ব্যাংক বাদে দেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে নতুন ৮টিসহ মোট ২৪টি ব্যাংক শেয়ারবাজারে অতালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রয়েছে ৮টি ব্যাংক।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিনিয়োকারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশয় ছিল শেয়ারবাজারে ভালো ব্যাংক আসুক। এনআরবিসি ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে যাচ্ছে। এতে বাজারের পরিধি আরও বাড়বে। এনআরবিসি ব্যাংকের মতো অন্যান্যা ব্যাংকের শেয়ারবাজারে দ্রুত তালিকাভুক্ত হোক সেটাই বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধক (আরজেএসসি) থেকে ব্যাংক কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন পায় এনআরবিসি ব্যাংক। এ বছরের ১৮ নভেম্বর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এনআরবিসি ব্যাংকের আইপিও’র আবেদন অনুমোদন দেয়। ব্যাংকের ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছে এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল পার্টনারস ইনভেস্টমেন্ট ও এএফসি ক্যাপিটাল।
লাইট নিউজ