পশ্চিমবঙ্গের বুকে সম্প্রীতির যে পরিচিত ছবি, তা যেন ক্রমশ বদলে যেতে শুরু করেছে। নিউটাউন এলাকার একটি অমানবিক ঘটনা অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে, যা দেখে শিউরে উঠছেন অনেকেই। নিজের বাড়িতেই চরম হেনস্থার শিকার হতে হল এক নিরীহ বৃদ্ধ দম্পতিকে। তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’, তাদের মেয়ে এক মুসলিম যুবককে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন। আর সেই কারণ দেখিয়েই দলবল নিয়ে ওই বৃদ্ধের বাড়িতে চড়াও হন স্থানীয় বিজেপি নেতা সুজয়। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, চশমা পরা ব্যক্তি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খালি গায়ে থাকা এক বৃদ্ধকে শাসাচ্ছেন। তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, হয় জামাইকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে হবে, নয়তো সপরিবারে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে। কারণ এটি হিন্দু পাড়া, এখানে অন্য ধর্মের কেউ থাকতে পারবে না।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ওই বৃদ্ধ এবং তার স্ত্রী বারবার তাদের অসহায়তার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেন। দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে কাতর কণ্ঠে ওই বৃদ্ধা মা বলেন, এই বয়সে তাদের দেখার আর কেউ নেই। নিজের সন্তানকে কি কখনও বাবা-মা দূরে ঠেলে দিতে পারে? কিন্তু তাদের এই মানবিক আকুতি ওই স্বঘোষিত ‘ধর্মরক্ষক’দের মন গলাতে পারেনি। বরং তাদের যুক্তির কোনো তোয়াক্কা না করেই ক্রমাগত হুমকি ও ধমক চলতে থাকে। ভিডিওতে শোনা যায়, ওই ব্যক্তি নির্লজ্জের মতো বলে চলেছেন যে, তাদের পাড়ায় ‘লাভ জিহাদ’ বরদাস্ত করা হবে না। বাবা-মা হয়ে সন্তানকে ত্যাগের মতো চরম অমানবিক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে।
এই ঘটনার পর থেকেই তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকাশ্য হুমকির নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ মদত। সুজয় নামের ওই ব্যক্তি খোদ শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের কথা উল্লেখ করেই এই ধরনের দাদাগিরি চালাচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, কীভাবে পরিকল্পিতভাবে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতিকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। বাংলার মাটিতে যেখানে যুগ যুগ ধরে সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করে এসেছেন, সেখানে রাজনীতির কারবারিরা নিজেদের ফায়দা লুটতে সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে ঢুকে বিষোদ্গার ছড়াচ্ছে। প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম হয় না এই চিরন্তন সত্যকে অস্বীকার করে জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণের চাপ সৃষ্টি করা এবং বয়স্ক মানুষদের এভাবে হেনস্থা করা স্পষ্টতই এক অশনি সংকেত। বাংলার বুকে এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতি আগামী দিনে আরো কত ভয়ংকর রূপ নিতে পারে, নিউটাউনের এই ঘৃণ্য ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।